সময় চলে যায়, হারিয়ে যায় অতীতের অদৃশ্য গহব্বরে; তবে সে শুধু চলেই যায় না, রেখে যায় ইতিহাস আর ঐতিহ্য। একসময় আমাদের পূর্বপুরুষদের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল বাংলার কুমারদের হাতের নিপুণ স্পর্শে তৈরি মৃৎ শিল্প। মাটির তৈরি থালা, বাসন, হাঁড়ি, পাতিল, ঘটি-বাটি, বদনা—গৃহস্থালির প্রায় সব নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীই ছিল মৃৎ শিল্পের দখলে। নানা রূপে ও রঙে এই শিল্প আমাদের সামনে নিয়ে এসেছিল এক বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি। কিন্তু কালের বিবর্তনে শত বছরের সেই ঐতিহ্যবাহী মৃৎ শিল্প আজ বিলুপ্তির পথে, যার কারণে শেরপুরের নকলাসহ বিভিন্ন এলাকার কুমারপাড়ায় বইছে কষ্টের সুর।
মৃৎ শিল্প বলতে বোঝায় মাটি দিয়ে বাংলার কুমাররা যে শৈল্পিক কারুকাজ সৃষ্টি করেন। এটি শুধু নিত্যব্যবহার্য পাত্র নয়, বরং ঘর সাজানোর নান্দনিক উপকরণও বটে। একসময় এই শিল্প ছিল বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। মাটির গন্ধ মাখা এই শিল্পে ছিল শিল্পীর সৃজনশীলতা ও হৃদয়ের মাধুর্য।
শেরপুরের নকলা উপজেলার গনপদ্দী ইউনিয়নের বিহাড়ীপাড় পালপাড়া এলাকাটি একসময় মৃৎ শিল্পের জন্য সুপরিচিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেখানে কুমার পরিবারের সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ২৫টিতে। এসব পরিবারের শতাধিক সদস্য এখনও এই পেশাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা নিজ হাতে মাটির জিনিসপত্র বানিয়ে বাজারে বিক্রি করে কোনোমতে সংসার চালান। অবাক করার বিষয় হলো, এই পালপাড়ার স্কুল-কলেজের অনেক শিক্ষার্থীও পড়ালেখার খরচ ও পরিবারের জন্য বাড়তি আয়ের লক্ষ্যে এই শিল্পকর্মে যুক্ত থাকে। তাদের হাতের তৈরি নকশা করা হাঁড়িপাতিল, চাড়ি, কলস, বদনা, পুতুল, ফুলের টব, ফুলদানী এবং জীবজন্তু, পাখিসহ বাংলার চিরাচরিত সব নিদর্শণ চোখ ধাঁধিয়ে দেয়।

মৃৎ শিল্পীদের শৈল্পিক দক্ষতা ও মনের ভেতরের লুকায়িত মাধুর্য দিয়েই তাঁরা এসব মনোমুগ্ধকর কারুকাজ করে থাকেন। এত চাহিদা থাকা সত্ত্বেও ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পটি আজ বিলুপ্তির মুখে। মৃৎ শিল্পীরা জানান, এর মূল কারণ হলো আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সামগ্রীর সহজলভ্যতা ও বাজার দখল। সিলভার, প্লাস্টিক এবং মেলামাইন সামগ্রী অতি দ্রুত মৃৎ শিল্পের জায়গা দখল করে নিয়েছে।
এক সময়ের রান্নাঘরের প্রধান উপাদান হাড়ি-কড়াই, দৈনন্দিন জলের জন্য ব্যবহৃত কলস, মুড়ি ভাজার সামগ্রী, পিঠার খাজ—এমনকি গৃহস্থালির চাহিদা মেটানো বহু তৈজসপত্র এখন আর কুমারদের হাতে তৈরি হচ্ছে না। মৃৎ শিল্পীরা জানান, মাটির তৈরি জিনিসপত্রের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমেনি, কিন্তু বাজারের সহজলভ্য ও টেকসই বিকল্প পণ্যের কারণে তারা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না। উৎপাদন খরচ বাড়লেও জিনিসপত্রের দাম বাড়েনি, ফলে লাভ কমে যাওয়ায় অনেকে বাধ্য হয়ে পৈতৃক এই পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন।
মৃৎ শিল্পী পার্বতি রানী বলেন, “একটা সময় ছিল যখন মাটির জিনিসের কদর ছিল ঘরে ঘরে। আমাদের হাতে গড়া হাঁড়ি-পাতিল, কলসি ছাড়া কারও রান্নাঘরই চলত না। এখন সেসব দিন অতীত। বাপ-দাদার শত বছরের এই কাজটা ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। কষ্ট হয় খুব, এই শিল্পটা আমাদের রক্তে মিশে আছে। নতুন করে আর কেউ এই কাজ শিখতেও চাইছে না, কারণ পেট চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।”
মৃৎ শিল্পী, অনিল কুমার পাল বলেন, “মাটির তৈরি জিনিসের চাহিদা আজও মানুষের মধ্যে আছে, কিন্তু বাজারে সিলভার, প্লাস্টিক আর মেলামাইনের সাথে আমরা পেরে উঠছি না। ওগুলো সস্তা আর টেকসই হওয়ায় মানুষ সেদিকেই ঝুঁকছে। আমরা কষ্ট করে জিনিস তৈরি করি, কিন্তু ন্যায্য দাম পাই না। মাটি, জ্বালানি সব কিছুর দাম বেড়েছে, কিন্তু আমাদের পণ্যের দাম বাড়েনি। এই শিল্প বাঁচিয়ে রাখতে গেলে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে, নইলে আমাদের মতো কারিগরদের না খেয়ে মরতে হবে।”
শিক্ষার্থী তমা রানী পাল বলে, “স্কুল থেকে ফিরে মায়ের সাথে কাজ করি। হাঁড়ি-পাতিল বানিয়ে বা রং করে যে টাকাটা পাই, সেটা দিয়ে আমার পড়ালেখার খরচ চলে, পরিবারেও সাহায্য হয়। কাজটা খুব আনন্দের, কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা হয়। আমার বাবা-মা চান না আমি বড় হয়েও এই পেশায় থাকি, কারণ এতে কোনো নিশ্চয়তা নেই। এত সুন্দর একটা শিল্প, কিন্তু আধুনিকতার ধাক্কায় হারিয়ে যাচ্ছে। যদি সরকারি সহযোগিতা পাই, তবে হয়তো আমরা ছাত্রছাত্রীরা এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার প্রেরণা পেতাম।”
শিক্ষক গোভরধন বলেন, “মৃৎ শিল্প কেবল একটি জীবিকা নয়, এটি আমাদের বাংলার হাজার বছরের লোকসংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। নকশার মাধ্যমে কুমাররা যে শৈল্পিক মাধুর্য ফুটিয়ে তোলেন, তা সত্যিই অসাধারণ। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আধুনিক সামগ্রীর প্রতিযোগিতায় এই শিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। এটি শুধু ২৫টি পরিবারের সমস্যা নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্যের ক্ষতি। এই শিল্পকে বাঁচাতে হলে এটিকে একটি কুটির শিল্প হিসেবে চিহ্নিত করে বিশেষ সরকারি ঋণ, বাজারজাতকরণের সুবিধা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা জরুরি। তা না হলে, আমরা অচিরেই আমাদের অমূল্য ইতিহাসকে হারাব।”
শত বছরের পুরনো এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রয়োজন কুমারদের আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং তাদের তৈরি পণ্যের জন্য নতুন বাজার সৃষ্টি করা। কেননা, এই শিল্পের বিলুপ্তি কেবল কয়েকটি পরিবারের জীবিকা হারানো নয়, এটি বাংলার হাজার বছরের লোকসংস্কৃতির এক মূল্যবান অংশ হারিয়ে যাওয়ারই ইঙ্গিত।


